বেক্সিমকো গ্রুপ নিয়ে যা বললেন ডা; মুহাম্মদ ইউনুস,
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক আহমেদ বেলাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের জানিয়েছে কোম্পানির পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। সেখান থেকে অর্থ ছাড়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে তাদের পক্ষে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হবে। তবে তারা বেতন পরিশোধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ আমাদের জানাতে পারেনি।’
বেক্সিমকোর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য গত আগস্টে জনতা ব্যাংক থেকে ৫৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। ব্যাংকটির কাছে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা। একক গ্রাহক ঋণসীমার তুলনায় ব্যাংকটি থেকে অনেক বেশি ঋণ নিয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রুপটিকে ঋণ দিয়ে জনতা ব্যাংক নিজেই সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকটির পক্ষ থেকে নতুন করে ঋণসহায়তা দেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতি মাসেই অর্থসহায়তার মাধ্যমে বেক্সিমকোর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এটি কোনো স্থায়ী সমাধানও নয়। বেক্সিমকো শ্রমিকরা বকেয়া বেতন পরিশোধ অথবা তাদের মালিককে মুক্তি দেয়ার দাবি তুলেছেন। এ দাবির যৌক্তিকতা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ২০টির মতো কারখানা রয়েছে, এর মধ্যে আটটি আরো দেড়-দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সেসব কারখানার শ্রমিকরাও এখন বকেয়া বেতনের দাবিতে মাঠে নেমেছেন।
বেক্সিমকোর শ্রমিকদের বেতন-ভাতার ইস্যুটি কীভাবে সমাধান করা যায় সেটি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলও বেশ চিন্তিত। দুইদিন ধরে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। বেক্সিমকোর কর্মকর্তারাও অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে বেশকিছু দাবি জানিয়েছেন। বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ইস্যুটি সমাধানে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে অর্থ উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টার বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার দিকনির্দেশনা অনুসারে বিষয়টি সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করছেন।’
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধাররা আত্মগোপনে যান। তাদের মধ্যে গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে আছেন। অন্য উদ্যোক্তারা পলাতক। গ্রুপটির কর্ণধারদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপে রিসিভার নিয়োগের বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। রফতানির আড়ালে ৯৫৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ১৭টি মামলা করেছে সিআইডি। তাছাড়া গ্রুপটির বিরুদ্ধে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আলাদা অনুসন্ধান চালাচ্ছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, ব্যক্তির অপরাধের দায়ে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে না। সর্বশেষ গতকালও বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘অনিয়মের মাধ্যমে যারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছেন, সেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে মরতে দেয়া হবে না। কারণ সব প্রতিষ্ঠান জাতীয় সম্পদ। এর সঙ্গে ব্যাংকের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সরবরাহ জড়িত। সেটি এস আলম হোক কিংবা বেক্সিমকো।’
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে বেক্সিমকো গ্রুপের পক্ষ থেকে ৪৫ কোটি ডলার রফতানি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে রফতানির এ অর্থ দেশে এসেছে কিনা সে বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ চাওয়া হলেও গ্রুপটির পক্ষ থেকে খুব বেশি তথ্য দেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো লিমিটেড চলতি বছরে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৫৮১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় কমেছে ৪৮ শতাংশ। আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১৩ কোটি টাকায়। আর এ সময় প্রতিষ্ঠানটির রিটেইন্ড আর্নিংস বা পুঞ্জীভূত মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্লকেড ও সরকার ঘোষিত কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা এবং সাধারণ ছুটির কারণে গত জুলাই-আগস্টে কোম্পানিটির উৎপাদনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বেক্সিমকো লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. লুৎফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বর্তমানে বেক্সিমকোর বস্ত্র খাতের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। আগের তুলনায় আমাদের কার্যাদেশ কমে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে মর্মে আশ্বস্ত করা গেলে ক্রেতারা ফিরে আসবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। ব্যাংকগুলো আমাদের এলসি খোলার সুযোগ করে দিলে ব্যবসা চালু রেখে ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হতো। ক্রেতাদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় গত হিসাব বছরের প্রথম ও চতুর্থ প্রান্তিকে ব্যবসা কমে গিয়েছিল। তবে আমরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি গত জুলাই-আগস্টে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বেতন দিতে দেরি হওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আমাদের কাছে কোনো কাঁচামাল নেই, যা ছিল সেগুলো পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এলসি খোলার ব্যবস্থা করে দিলে সমস্যা থাকত না। রফতানি না হলে ব্যবসা থেকে আয় হবে না। বর্তমানে যেসব কার্যাদেশ আছে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানায় কাজ হচ্ছে না। ফলে বিষয়টির সমাধান না হলে সামনের দিনগুলোয় ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।’
No comments: